ঢাকা , শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২২ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন মোদির দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড এমওইউ মোদীকে দশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে ছবি উপহার ইউনূসের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত বাস চালকের হদিস মেলেনি আহত শিশু আরাধ্যকে ঢাকায় হস্তান্তর নিহত বেড়ে ১১ স্বস্তির ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৬০ প্রাণ চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার বানালেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা আ’লীগের নেতাদের রাজকীয় ঈদ উদযাপনে ক্ষুব্ধ কর্মীরা আন্দোলনে ফিরবেন বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা মাদারীপুরে আগুনে পুড়ল ২ বাড়ি ভৈরবের ত্রি-সেতুতে দর্শনার্থীদের ভিড় বর্ষবরণের আয়োজন, পাহাড়ে উৎসবের রঙ ঈদের আমেজ কাটেনি বিনোদন স্পটে ভিড় আ’লীগকে নিষিদ্ধ করা বিএনপির দায়িত্ব নয় নতুন নিয়মে বিপাকে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেয়ে স্বস্তিতে সাড়ে ৩ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ঈদযাত্রায় সদরঘাটে চিরচেনা ভিড় মিয়ানমারে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
মুন্সিগঞ্জ মুদ্রণ শিল্প নগরী’র ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি ৮ বছরে

ব্যয় বাড়লেও চালু হয়নি সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্ক

  • আপলোড সময় : ২৬-০৯-২০২৪ ১২:৫৬:২৬ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৬-০৯-২০২৪ ১২:৫৮:২৮ পূর্বাহ্ন
ব্যয় বাড়লেও চালু হয়নি সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্ক
‘সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্ক’ প্রকল্পের নামে অর্থ লোপাটের দফায় দফায় ব্যায় বাড়ানো হয়েছে। চার বছরে শেষ হওয়ার কথা প্রকল্পটির। ১৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও শেষ হয়নি প্রকল্পের কাজ। এখনো ৪০ শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন বাকি। কয়েক দফায় খরচ বাড়িয়ে ব্যয় উন্নীত করা হয় ৭শ’ ১৯ কোটি ২১ লাখ টাকায়। অপরদিকে ব্যর্থ এই প্রকল্পের পরিচালককেই এবার প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ দেয়া হয়েছে বিসিক বাস্তবায়নাধীন ‘মুন্সিগঞ্জ মুদ্রণ শিল্প নগরী’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে। জেলার সিরাজদিখান উপজেলার চিত্রকোট ইউনিয়নের মরিচা এলাকায় শিল্প নগরীটি হওয়ার কথা। ৮ বছর আগে প্রকল্প ঘোষণা করা হলেও এখন অবধি ভূমি অধিগ্রহণই সম্পন্ন হয়নি। এই প্রল্পের ভূমি অধিগ্রহণ নিয়েও রয়েছে অনিয়মের অভিযোগ।
দৈনিক জনতার অনুসন্ধানে এমনটাই উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্ক’ ৮২৯টি প্লটে ৫৭০টি কারখানা স্থাপিত হওয়ার কথা এই শিল্পপার্কে। এতে কর্মসংস্থান হওয়ার কথা পদ্মাপাড়ের অন্তত : ১ লাখ মানুষের। প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিলো ৩শ’৩৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা। মূলত: প্রকল্প পরিচালক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং আ’লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের নিকটাত্মীয় জাফর বায়েজিদের দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অর্থ লোপাটের কারণেই ব্যয় বাড়লেও চালু হয়নি শিল্প পার্ক। শিল্প-কারখানা স্থাপন কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হলেও প্রকল্পের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিলো সরকারি অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা। পাতানো টেন্ডারের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যাদেশ দেয়া হয় ১৩ ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও আ’লীগ নেতার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। তারা ৪০ শতাংশ কাজ বাকি রেখেই তুলে নেন বিল। সর্বশেষ চেষ্টা ছিলো চলতিবছর জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ এবং ব্যয় আরেক দফা বৃদ্ধি। কিন্তু তার আগেই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে উৎখাত হন শেখ হাসিনা। ফলে অসম্পূর্ণ এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিসিক কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘সিরাজগঞ্জ শিল্প পার্ক’।
শিল্প মন্ত্রণালয়ে আওয়ামী পঞ্চপান্ডব : যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার নূরুল আমিন খান, মো. হাফিজুর রহমান, পরিচালক (প্রকৌশল ও প্রকল্প বাস্তবায়ন) মো. আব্দুল মতিন, মোহাম্মদ রাশেদুর রহমান, পুরকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনির হোসেনের সমন্বয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কথা সর্বজনবিদিত। বিগত আওয়ামী জমানা জুড়ে এই সিন্ডিকেট সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিজেদের করায়ত্ত্বে রাখে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দফতর। এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারিদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পোস্টিং, প্রকল্প গ্রহণ, বাস্তবায়ন, ঠিকাদারিসহ প্রায় সব সিদ্ধান্তই গৃহিত হতো এই সিন্ডিকেটের অঙ্গুলি হেলনে। এদের মধ্যে মো. আব্দুল মতিন হলেন বিসিক পরিচালক। তার বিরুদ্ধে রয়েছে বেনামে ঠিকাদারির লাইসেন্স নিয়ে সরকারের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ। তার বেনামী প্রতিষ্ঠানটি বিসিকের উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারির সঙ্গে যুক্ত। হাফিজুর রহমান হচ্ছেন মুন্সিগঞ্জে অবস্থিত বিসিক কেমিক্যাল শিল্পপার্কের প্রকল্প পরিচালক। প্রকল্পটির সঙ্গে তিনি যুক্ত রয়েছেন ৪ বছর ধরে। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি বলতে তেমন কিছুই না হলেও হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। তার বিরুদ্ধে রয়েছে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। অভিযোগের তদন্ত পর্যায়ে বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, মুন্সিগঞ্জ প্রকল্পে আর্থিক হিসেবের গরমলি পাওয়ায় ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর হাফিজুর রহমানের কাছে ব্যাখ্যা তলব করা হয়। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রীর ‘কাছের লোক’ হওয়ায় সে যাত্রায় রক্ষা পান তিনি।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের ডিজিএম মোহাম্মদ রাশেদুর রহমান। চাকরিতে তার নিয়োগটাই হয়েছে ‘ছাত্রলীগ’ পরিচয়ে। ছাত্রলীগ, বুয়েট শাখার প্রভাবশালী নেতা ছিলেন রাশেদ। তার দাপটে তটস্থ থাকতেন মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা। রাশেদের প্রভাব এতোটাই প্রবল যে, একনেকে অনুমোদিত একটি প্রকল্পের অঙ্গভিত্তিক পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এ কারণে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা স্বরূপ বিসিক থেকে একবার সরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু প্রভাশালী আওয়ামী মন্ত্রীর এক টেলিফোনে পুনরায় বিসিক প্রধান কার্যালয়ে ফিরিয়ে আনা হয় তাকে।
মতিন সিন্ডিকেটে প্রকৌশল বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করেন মো. মনির হোসেন। তিনিও ছাত্রলীগ বুয়েট শাখার যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরিচালক (প্রকল্প) মো. আব্দুল মতিনের সঙ্গে যোগসাজশ করে অন্য ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে সরকারের সঙ্গে ব্যবসা করেন তিনি নিজেই। এভাবে তিনি সরকারি বেতনের পাশাপাশি ব্যবসার নামে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের পঞ্চপান্ডব খ্যাত সিন্ডিকেটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য যুগ্ম-সচিব মো. নূরুল আমিন খান। বাড়ি গোপালগঞ্জে হওয়ায় এতোদিন এই কর্মকর্তার দাপটই ছিলো অন্যরকম। জানা যায়, হাফিজুর রহমান এই কর্মকর্তার বাসায় নিত্যদিনের বাজার সরবরাহ করেন। সিন্ডিকেটের হয়ে হাফিজুর রহমান মো. নূরুল আমিন খানকে দিয়ে শিল্প সচিবকে ‘ম্যানেজ’ করে দুর্নীতিগ্রস্ত জাফর বায়েজিদকে মুন্সিগঞ্জের মুদ্রণ শিল্প প্রকল্পের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়ার কাজটি করান। উদ্দেশ্য, প্রকল্পের সমুদয় টেন্ডারের কার্যাদেশ নির্বিঘ্নে নিজের বেনামী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করিয়ে অর্থ লোপাট। তাদেরই লক্ষ্য হাসিলে গত ১৯ সেপ্টেম্বর তার পদায়ন সংক্রান্ত আদেশ (স্মারক নং-৩৬.০০.০০০০.০৮৫.১৪.০০৭.২২-৪৭ তাং ১৯/০৯/২০২৪) দেয় মন্ত্রণালয়। যদিও জাফর বায়েজিদের মূল কর্মস্থল সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্ক প্রকল্পের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প থেকে মুন্সিগঞ্জ মুদ্রণ শিল্প নগরীর দূরত্ব ২শ’ কিলোমিটার। অসামঞ্জস্যপূর্ণ এ পদায়নের নেপথ্যে রয়েছে মতিন সিন্ডিকেটর অদৃশ্য ক্যারিকেচার।
এদিকে সিরাজগঞ্জ প্রকল্পে ৪০ ভাগ কাজ অবশিষ্ট থাকা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক জাফর বায়েজিদ গণমাধ্যমকে বলেন, প্রকল্পতো কমপ্লিট প্রায়। এখন প্লট বরাদ্দের প্রস্তুতি চলছে। এতোদিনে এটি উদ্বোধন হয়ে যেতো। কিন্তু পট পরিবর্তনের কারণে এখন কবে উদ্বোধন হবে বলতে পারছি না। তবে মুন্সিগঞ্জ মুদ্রণ শিল্পনগরী প্রকল্পে ইতিমধ্যেই তিনি যোগদান করেছেন বলে জানান।
এদিকে দুর্নীতিবাজ, ব্যর্থ এই প্রকল্প পরিচালককেই এবার প্রকল্প পরিচালক হিসেবে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ দেয়া হয়েছে বিসিক বাস্তবায়নাধীন ‘মুন্সিগঞ্জ মুদ্রণ শিল্প নগরী’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে। জেলার সিরাজদিখান উপজেলার চিত্রকোট ইউনিয়নের মরিচা এলাকায় শিল্প নগরীটি হওয়ার কথা। ৮ বছর আগে প্রকল্প ঘোষণা করা হলেও এখন অবধি ভূমি অধিগ্রহণই সম্পন্ন হয়নি। ফলে এ প্রকল্পে অন্তত : ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হওয়া দূরে থাক, কর্ম ও ভূমিহীন হয়ে পড়েছেন শত শত কৃষক। ৫০ একর জমির ওপর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। এর জন্য প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয় ১৪০ কোটি টাকা। দেশের প্রথম মুদ্রণ শিল্প নগরীতে থাকবে ৩৮৫টি প্লট। ২০১৮ সালে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিলো। এবার আ’লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের নিকটাত্মীয়কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে মুন্সিগঞ্জ বিসিক মুদ্রণ শিল্প নগরীর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে। দায়িত্ব প্রাপ্ত এ কর্মকর্তার নাম জাফর বায়েজিদ। তিনি একাধারে সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্ক প্রকল্পের পরিচালকও বটে। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে গত ১৯ সেপ্টেম্বর তাকে নিয়োগ দেয়া হয় মুন্সিগঞ্জ বিসিকের প্রকল্প পরিচালক পদে। সাবেক একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর অঙুলি হেলনে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের গভীরে শেকড় গেড়ে বসা দুর্নীতিবাজ আওয়ামী সিন্ডিকেট কাজ করেছে এ নিয়োগের অনুঘটক হিসেবে। তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স